মাযার ও কবরের উদ্দেশ্যে কুরবানী, মান্নত ও হাদীয়া পেশ করার হুকুম কি?

কবর ও মাযারের উদ্দেশ্যে কুরবানী ও মান্নত পেশ করার হুকুমঃ حكم تقديم القرابين والنذورللقبوروالمزارات
কুরবানী হল প্রত্যেক ঐ বস্তু যার মাধ্যমে নৈকট্য তলব করা হয়। যেমনঃ নযর-নেয়ায, পশু যবেহ, খাদ্য দ্রব্য ইত্যাদীর মাধ্যমে নৈকট্য কামনা করা হয়।
আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও ছাওয়াবের নিয়তে পশু কুরবানী ও যবাই করা একটি অন্যতম বিরাট এবাদত। এটি খালেসভাবে একমাত্র আল্লাহর জন্যই করতে হবে। সুতরাং সম্মান এবং নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্য আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য যবেহ করা হল বড় শির্ক। যেমন কবর, অলী-আওলীয়া, জিন, শয়তান ইত্যাদির জন্য যবেহ করা।

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
হে রসূল আপনি বলুঃ নিশ্চয় আমার ছালাত, আমার কোরবানী, আমার জীবন, আমার মরন সবই সমগ্র জগতের পালন কর্তা আল্লাহর জন্য উৎসর্গীত। তার কোন শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আর আমিই মুসলিমদের প্রথম ব্যক্তি। (সূরা আন্‌আমঃ ১৬২-১৬৩)

আরো আল্লাহতালার বাণীঃ
فصل لربك وانحر
তুমি তোমার প্রতি পালকের জন্য নামায পড় এবং কুরবানী কর। (সূরা কাওসারঃ ২)

রাসূল (সাঃ) বলেনঃ
لعن الله من ذبح لغير الله
যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে পশু যবাই করবে, তার উপর আল্লাহর লানত। (মুসলিম)
সুতরাং দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে যখন প্রমাণিত হল যে কুরবানী করা বিরাট একটি এবাদত এবং তা একমাত্র আল্লাহর জন্যই করতে হবে, তখন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য যেমন কবর, মাযার, অলী-আওলীয়া এবং জিন ইত্যাদির নৈকট্য হাসিল করার জন্য কুরবানী কিরা শির্ক, যা একজন মুসলিমকে ইসলামের গন্ডি থেকে বের করে দেয়।
কবর পাকা করার হুকুমঃ حكم البناء على القبور
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর পাকা করা, তার উপ চুনকাম করা, কবরের উপর মসজিদ ও গম্বুজ নির্মান করতে নিষেধ করেছেন। তিনি কবরকে মাটির সমান করে রাখতে আদেশ দিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহও ওয়া সাল্লামের আদেশ যদি পালন করা হত তাহলে কবর নিয়ে এত বাড়াবাড়ি হত না। কিন্তু যখনই নবীর (সাঃ)এর তরীকার বিরোধীতা করে ঐগুলোর উপর কুব্বা, গম্বুজ এবং মসজিদ নির্মিত হল তখনই মুর্খগন ধারনা করল যে, উহাতে দাফন কৃত ব্যক্তিগন যে কোন ধরণের উপকার বা অপকার সাধনে সক্ষম। তারা ফরিয়াদকারীর ফরিয়াদ শুনেন এবং বিভিন্ন প্রয়োজন পুরন করেন। সুতরাং তারা তাদের নিকট নযর-নেয়ায, কুরবানী পেশ করতে লাগল। এমনকি ঐ কবর গুলি উপাসনার স্থানে পরিণত হল। অথচ নবী (সাঃ) হাদীছে দোয়া করেছেন এই বলেঃ
اللَّهُمَّ لَا تَجْعَلْ قَبْرِي وَثَنًا يُعْبَدُ اشْتَدَّ غَضَبُ اللَّهِ عَلَى قَوْمٍ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ
হে আল্লাহ্! আমার কবরকে পূজার স্থানে পরিণত করো না, যাতে এর ইবাদত করা হয়। আল্লাহ্ অভিশাপ করেছেন ঐ জাতিকে যারা তাদের নবীদের কবর সমূহকে কেন্দ্র করে মসজিদ তৈরী করেছে।” (মুসনাদে আহমাদ) তিনি এই দুয়া এ জন্যই করেছিলেন কারন তিনি জানতেন যে, অন্যান্যদের কবরে ঐ ধরনের কিছু ঘটবে। আর বাস্তবেও অনেক ইসলামী দেশে কবর পুজা হয়েছে এবং হচ্ছে।

আবু হুরায়রা (রাঃ) এর সূত্রে বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ
لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ
ইহুদী খৃষ্টানদের প্রতি আল্লাহ্র লানত। কারণ তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছে।”
আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আবুল হায়্যায আল আসাদীকে বলেন, আমি কি তোমাকে এমন আদেশ দিয়ে প্রেরণ করব না, যা দিয়ে নবী (সাঃ) আমাকে প্রেরণ করেছিলেন?
أَنْ لَا تَدَعَ تِمْثَالًا إِلَّا طَمَسْتَهُ وَلَا قَبْرًا مُشْرِفًا إِلَّا سَوَّيْتَهُ
কোন মূর্তী পেলেই তা ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলবে। আর কোন কবর উঁচু পেলেই তা ভেঙ্গে মাটি বরাবর করে দিবে।” (মুসলিম)
সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈন (রাঃ)এর যুগে ইসলামী শহর সমূহে কোন কবর পাকা করা বা কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণ করা হয় নি। না নবী (সাঃ) এর কবরে না অন্য কারও কবরে।
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কবরের নিকট কুরবানী করার হুকুমঃ حكم الذبح لله عند القبور تبركا
আর যদি কেউ বলেনঃ কবরের উদ্দেশ্যে নয়; বরং অলী-আওলীয়ার কবরকে বরকতময় মনে করে তার পাশে যদি আল্লাহর জন্যই পশু কুরবানী করা হয় তাহলে এর হুকুম কি হবে?
এ কথার উত্তরে আমরা বলব যে, তাও হারাম ও বিদআত হতে মুক্ত নয়। জনৈক ব্যক্তি বুওয়ানা নামক স্থানে একটি উট যবাই করার মান্নত করল। নবী সাল্লাল।লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ উহাতে জাহেলী যামানার কোন মূর্তি ছিল কি যার উপাসনা করা হত? লোকেরা বললঃ না, তা ছিল না। আবার তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ওখানে কি তাদের কোন ঈদ-উৎসব পালিত হত? তারা বললঃ না, তাও ছিল না। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তাহলে তুমি তথায় তোমার মান্নত পূর্ণ করতে পার। (আবু দাউদ)
উক্ত হাদীছ থেকে অতি সহজেই যা বুঝা যাচ্ছে, তাতে যদি কোন মূর্তি পূজা হত কিংবা শির্কের কোন অনুষ্ঠান হত, তাহলে তিনি সেখানে উট যবাই করতে নিষেধ করতেন। যদিও মান্নতকারীর নিয়ত ছিল আল্লাহর জন্য যবাই করা।

শেষ কথাঃ الختام
আমাদের দেশে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের যথেষ্ট তৎপরতা লক্ষ করা যায়। ব্যক্তিগত ও দলবদ্ধভাবে সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি এবং অন্যান্য অপরাধের প্রতিবাদে বেশ ভূমিকা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ক্কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, দেশের সর্বত্র যে সমস্ত শির্ক-বিদআত হচ্ছে, তার তেমন কোন প্রতিবাদ হচ্ছে না। কেউ যদি প্রতিবাদ করেন, ক্ষেত্র বিশেষে তারও আবার বিরোধীতা করা হয়। অথচ সবচেয়ে বড় কবীরা হচ্ছে গুনাহ শির্ক। কোন মানুষ যদি আজমীর শরীফ ও শাহ জালালের মাজার যিয়ারত করে আসে, তার সম্মান করা হয় এবং তার কাজকে ভাল বলে সমর্থন করা হয়।
অপর পক্ষে প্রকাশ্যে কেউ মদ পান করলে তাকে জুতা পেটানো হয়। মদ পান করা একটি বড় ধরণের গুনাহ হলেও মাজার ও দর্গাগুলোতে যা হচ্ছে, তা মদ পান করার চেয়ে অনেক বড় ধরণের অপরাধ। বড় আফসোসের বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশের লোকেরা এখনও তা বুঝে উঠতে পারে নি। তাওহীদ ও শির্কের মধ্যে যতদিন আমাদের দেশরে লোকেরা সঠিক অর্জন করতে না পারবে, ততদিন আমাদের দেশে ইসলামের বেহাল অবস্থার উন্নতির আশা দূরাশাই থেকে যাবে।

 

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: