আমরা কিভাবে ঈদের আনন্দ উপভোগ করব? শেষ পর্ব

ঈদের নামাযের হুকুম حكم صلاة العيد
ইহা দ্বীন ইসলামের প্রকাশ্য নিদর্শন সমূহের অন্যতম। এই নামাযের হুকুম নিয়ে আলেমদের থেকে একাধিক মত পাওয়া যায়। কারও মতে ঈদের নামায হল ফরজে কেফায়া। ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ইহাকে ওয়াজিব বলেছেন। আল্লামা বিন বায (রঃ)এর মতে ঈদের নামায ফরজে আইন। তবে অধিকাংশের মতে ইহা সুন্নতে মুয়াক্কাদা; ওয়াজিব বা ফরজ নয়। এ মতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য।
মোট কথা নবী করীম (সাঃ) এ নামায তাঁর উম্মতের জন্য শরীয়ত সিদ্ধ করেছেন এবং তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি মহিলাদেরকেও তাতে উপস্থিত হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আর নিজেও তিনি উহা স্থায়ী ভাবে আদায় করেছেন। সুতরাং ঈদের নামায ইসলামের একটি গুরুত্ব নিদর্শন। কোন মুসলিমের জন্যই এ সম্পর্কে অবহেলা করা অনুচিত।
ঈদের নামাযের সময়ঃ وقتها
এক তীর পরিমাণ সূর্য উপরে ওঠা থেকে তা পশ্চিমাকাশে ঢলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ঈদের নামাযের সময়। ঈদুল আজহা জলদী করে এবং ঈদুল ফিতর দেরী করে আদায় করা সুন্নত।
যে স্থানে এ নামায পড়বেঃ أين تقام صلاة العيد؟
ঈদ গাহ বা মাঠে এ নামায আদায় করা সুন্নত। কারণ বশত মসজিদেও আদায় করা যায়।

ঈদের দিনের কতিপয় মুস্তাহাব আমলঃ بعض الأعمال المستحبة في يوم العيد
১) ঈদ উপলক্ষে একে অপরকে অভিনন্দন ও ঈদের শুভেচ্ছা জানানো সুন্নত। তবে এর নির্দিষ্ট কোন পদ্ধতি নেই। অবশ্য সালাফে সালেহীন থেকে প্রমাণিত আছে যে, তাঁরা এই দিনে এক অপরকে বলতেনঃ تقبل الله منا ومنكم আল্লাহ্ আমাদের ও আপনাদের সৎ আমলগুলো কবুল করুন। আরব দেশে পরস্পর ঈদ সাঈদ عيد سعيد , ঈদ মোবারক এবং كل عام وأنتم بخير এ সমস্ত কথাগুলো বলতে শুনা যায়।
২) পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা।
৩) গোসল করে সুন্দর পোষাক পরিধান করা। কিন্তু মহিলাগণ তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না এবং আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করবে না।
৪) ঈদুল ফিতরের নামাযে যাওয়ার পূর্বে কিছু খেয়ে বের হওয়া সুন্নাত।
৫) ঈদের নামাযে বের হওয়ার আগে ফিতরা আদায় করবে। ঈদের দুই-এক দিন আগে ফিতরা পরিশোধ করলেও চলবে। নবী (সাঃ) ঈদের নামাযের জন্য বের হওয়ার পূর্বে ফিতরা আদায় করতে বলেছেন। তিনি বলেনঃ
من أداها قبل الصلاة فهي زكاة مقبولة ومن أداها بعد الصلاة فهي صدقة من الصدقات
যে ব্যক্তি নামাযের পূর্বে ফিতরা আদায় করল, তার ফিতরা হিসেবে কবুল হবে। আর যে ব্যক্তি নামাযের পর আদায় করল, তার ফিতরা সাধারণ সাদকা হিসেবে গণ্য হবে। (আবু দাউদ)
৬) চলার পথে আওয়াজ করে তাকবীর পাঠ করা। তাকবীরের শব্দগুলো হচ্ছেঃ
اللهُ أكْبَرُ اللهُ أكْبَرُ، لاَ إلَهَ إلاَّ اللهُ ، اللهُ أكْبَرُ اللهُ أكْبَرُ وَللهِ الْحَمْدُ ঈদুল ফিতরের চাঁদ উঠার পর থেকে এই তাকবীরগুলো পড়া শুরু হবে এবং ঈদের নামায পড়ার পূর্ব পর্যন্ত চলবে।
৭) শীঘ্র শীঘ্র ঈদের মাঠে যাওয়া।
৮) এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা। (বুখারী)
৯) ঈদের দিনে উন্নত খাবার খাওয়া এবং পোষাক-পরিচ্ছদে মাত্রাতিরিক্ত করা মুস্তাহাব।

ঈদের নামায আদায়ের পদ্ধতিঃ كيفية صلاة العيد
নামাযের সময় উপস্থিত হলে ইমাম আগে বেড়ে সবাইকে নিয়ে দু রাকাত নামায আদায় করবেন। এ নামাযে আযান ও ইকামত নেই। মাইকে ডাকা-ডাকিও নেই। সুতরাং মাইকে ডাকা-ডাকি করা বিদআত। অতঃপর প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফতিহা পাঠ করবে। দু রাকাতেই কিরাত স্বরবে পড়বে। সুন্নত হল প্রথম রাকআতে সূরা আ’লা এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা গাশিয়া পড়া। সালামের পর ইমাম চলমান পরিস্থিতির প্রতি লক্ষ্য করে খুতবা প্রদান করবেন।
ঈদের নামাযে তাকবীর সংখ্যাঃ عدد التكبيرا ت الزوائد في صلاة العيد
প্রথম রাকাতে তাকবীরে তাহরিমার পর ছয়টি অতিরিক্ত তাকবীর দিবে। তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত অতিরিক্ত সাতটি তাকবীর দেওয়ার কথাও সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। দ্বিতীয় রাকাতে সিজদা থেকে উঠার তাকবীর বাদ দিয়ে পাঁচটি অতিরিক্ত তাকবীর পাঠ করবে। ১২ তাকবীরে ঈদের সালাত আদায় করার পক্ষে অনেকগুলো সহীহ হাদীছ রয়েছে। কাছীর বিন আব্দুল্লাহ তার পিতা হতে আর তার পিতা তার দাদা হতে বর্ণনা করেন যে,
أن النبي صلى الله عليه و سلم كبر في العيدين في الأولى سبعا قبل القراءة وفي الآخرة خمسا قبل القراءة
নবী (সাঃ) দুই ঈদের নামাযে প্রথম রাকআতে কিরাআতের পর সাত তাকবীর এবং দ্বিতীয় রাকআতে কিরাআতের পূর্বে পাঁচ তাকবীর পাঠ করতেন। (তিরমিজী, ইবনে মমাজা ও দারামী)
ইমাম তিরমিজী (রঃ) বলেনঃ ঈদের নামাযের তাকবীরের ব্যাপারে বর্ণিত এটিই সর্বোত্তম হাদীছ। এর উপরই নবী (সাঃ)এর কতক বিজ্ঞ সাহাবী এবং অন্যান্য বিদ্যানগণ আমল করেছেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি এভাবেই মদীনাতে ঈদের নামায পড়েছেন। এটিই ইমাম মালেক, শাফেঈ এবং আহমাদ (রঃ)এর মাজহাব।
প্রত্যেক তাকবীরের সাথে দু হাত উত্তোলন (রাফউল ইয়াদায়ন) করবে। অবশ্য হাত না উঠালেও কোন অসুবিধা নেই। প্রত্যেক দুই তাকবীরের মধ্যবর্তী সময়ে নবী (সাঃ) থেকে কোন দুআ বা যিকির পাঠ করার কথা প্রমাণিত নেই। তবে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে দুই তাকবীরের মাঝখানে আল্লাহর প্রশংসা, তাঁর বড়ত্ব এবং নবী (সাঃ)এর উপর দরূদ পাঠ করার কথা পাওয়া যায়।
ঈদের নামাযের অতিরিক্ত তাকবীরসমূহ এবং খুতবা সুন্নত; ওয়াজিব বা আবশ্যক নয়।
আমাদের দেশের অধিকাংশ স্থানেই ছয় তাকবীরে ঈদের নামায পড়া হয়। এটি জায়েয হলেও উত্তম এবং সুন্নাতের খেলাফ। কারণ এ মর্মে রাসূল(সাঃ) থেকে কোন সহীহ হাদীস পাওয়া যায় না।
ঈদের নামাযের পূর্বে বা পরে কোন প্রকার নফল নামায পড়া জায়েয নেই। তবে ঈদের নামায মসজিদে হলে বসার পূর্বে দু রাকাআত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ে নিবে।
একবার আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এক ব্যক্তিকে দেখলেন, ঈদের নামাযের পূর্বে নফল নামায পড়ছে। তিনি প্রতিবাদ করলে উক্ত ব্যক্তি বললঃ আল্লাহ আমাকে নামায পড়ার কারণে শাস্তি দিবেন না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেনঃ নামাযের কারণে শাস্তি দিবেন না। তবে বিদআত করার কারণে শাস্তি দিবেন।
ঈদের নামাযে মহিলাদের অংশ গ্রহণঃ حضور النساء في صلاة العيد
ঈদের নামায, জুমআর নামায এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জামাআতে মহিলাদের উপস্থিত হওয়া জায়েয। উম্মে আতীয়া (রাঃ) বলেনঃ
سَمِعْتُ رسول الله صلى الله عليه وسلم يَقُولُ« يَخْرُجُ الْعَوَاتِقُ وَذَوَاتُ الْخُدُورِ أَوِ الْعَوَاتِقُ ذَوَاتُ الْخُدُورِ وَالْحُيَّضُ وَلْيَشْهَدْنَ الْخَيْرَ وَدَعْوَةَ الْمُؤْمِنِينَ ، وَيَعْتَزِلُ الْحُيَّضُ الْمُصَلَّى
আমি রাসূল (সাঃ)কে বলতে শুনেছি, ঈদের নামাযে পর্দার আড়ালের যুবতী মহিলাগণও বের হবে। হায়েয বিশিষ্ট মহিলাগণও অংশ গ্রহণ করবে। তারা কল্যাণের কাজে অংশ নিবে এবং দুআয় শরীক হবে (ঈদের খুতবা শুনবে)। তবে তারা নামাযে অংশ গ্রহণ করবে না। (বুখারী)
আমাদের দেশে মহিলাদের ঈদের নামাযে অংশ গ্রহণের কোন ব্যবস্থা রাখা হয় না। এটি ঠিক নয়। এ অবস্থার অবসান হওয়া উচিত।

ঈদের দিনের বিনোদনঃ كيف نتمتع بفرح وسرور العيد؟
১) আত্মীয় ও মুসলিম বন্ধ-বান্ধবের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করাঃ
পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি এবং সকল আত্মীয় স্বজনের অন্তরে বৈধ পন্থায় আনন্দ প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা এবং তাদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা এবং মুসলিম বন্ধু-বান্ধবদের সাথে কুশল বিনিময় করা এবং তাদেরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানানো ঈদের বিনোদনের অন্তর্ভূক্ত।

২) দূরের আত্মীয়দেরকে এই পবিত্র ও খুশীর দিনে ভুলে না যাওয়াঃ
দূরের আত্মীয়দের বাড়িতে যাবো এবং তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে সাধ্যানুযায়ী উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা ঈদের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক।

৩) গরীব-দুঃখীদের খুঁজ-খবর নেওয়াঃ
সাহায্য-সহযোগীতার হাত প্রসারিত করে গরীব-দুঃখীদেরকেও ঈদের আনন্দে শরীক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ছাওয়াবের কাজ।

৪) বৈধ খেলা-ধুলার আয়োজন করাঃ
অনেকেই মনে করেন, ইসলামে খেলা-ধুলা ও আনন্দ-ফুর্তি করার মত কিছু নেই। তাদের ধারণা ঠিক নয়। আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ একদিন আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমার ঘরের সামনে দন্ডায়মান দেখতে পেলাম। তখন হাবশীগণ মসজিদে খেলা করছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে আপন চাদর দিয়ে পর্দা করে রাখছিলেন আর আমি তাদের খেলা অবলোকন করছিলাম। অন্য বর্ণনায় আছে, তারা অস্ত্র নিয়ে খেলা করছিলেন। এ হাদীছ থেকে বৈধ খেলা-ধুলার আয়োজন করার দলীল রয়েছে। অন্য হাদীছে এসেছে, নবী (সাঃ) এবং তাঁর স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) কে নিয়ে পূর্ণিমার রাতে একাধিকবার দৌড় প্রতিযোগীতায় নেমেছিলেন। প্রথমবার আয়েশা (রাঃ) জয়লাভ করেন। দ্বিতীয়বা দৌড় প্রতিযোগীতায় রাসূল (সাঃ) আয়েশাকে পরাজিত করে দেন।

৫) ঈদের দিন ইসলামী কবিতা আবৃত্তি ও তাওহীদি জাগরণ মূলক কিছু গাওয়া বৈধঃ
বিবাহের অনুষ্ঠানে ও ঈদের দিনে ইসলাম আনন্দ ও বিনোদন করার অনুমুত দিয়েছে। আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ
دخل أبو بكر وعندي جاريتان من جواري الأنصار تغنيان بما تقاولت الأنصار يوم بعاث قالت وليستا بمغنيتين، فقال أبو بكر أمزامير الشيطان في بيت رسول الله ؟ وذلك يوم عيد، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم يا أبا بكر إن لكل قوم عيداً وهذا عيدنا
একদিন আবু বকর (রাঃ) আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন দু’জন আনসারী বালিকা বুয়াছ যুদ্ধে তাদের বীরত্ব সম্পর্কিত গান গাচ্ছিল, কিন্তু তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না। আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ আশ্চর্য! আল্লাহর রাসূলের ঘরে শয়তানের বাদ্য! এদিনটি ছিল ঈদের দিন। আবু বকর (রাঃ)এর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে, আর এদিন হল আমাদের ঈদ। ( বোখারি)
রাবী বিনতে মুআওযয়য (রাঃ) বলেনঃ
جاء النبي صلى الله عليه وسلم حين بني علي فجلس على فراشي كمجلسك مني، فجعلت جويريات لنا يضربن بالدف، ويندبن من قتل من آبائي يوم بدر، إذ قالت إحداهن وفينا نبي يعلم ما في غد. فقال دعي هذه وقولي بالذي كنت تقولين
যখন আমার বিবাহের অনুষ্ঠান হচ্ছিল তখন রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এসে আমার বিছানায় এমনভাবে বসলেন যেমন তুমি বসেছ। তখন কয়েকজন বালিকা দফ বাজাচ্ছিল ও আমাদের পূর্ব-পুরুষদের মাঝে যারা বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন তাদের প্রশংসামূলক সংগীত গাচ্ছিল। এ সংগীতের মাঝে এক বালিকা বলে উঠল। আমাদের মাঝে এমন এক নবী আছেন যিনি জানেন আগামী কাল কি হবে। তখন আল্লাহর রাসূল(সাঃ) বললেনঃ এ কথা বাদ দাও এবং যা বলছিলে তা বল। (বুখারী) তাই অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম নিমোক্ত কয়েকটি সময়ে দফ অর্থাৎ এক দিকে খোলা ঢোল জাতীয় বাদ্য বাজানোকে জায়েজ বলেছেন।

ঈদের দিনে যা বর্জনীয়ঃ ما يجب تجنبه يوم العيد
ঈদ মুসলমানদের আত্মার পরিশুদ্ধি, মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতি, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মার্জিত উৎসব। তবে দুঃখের ব্যাপার হল আমরা অনেকেই এ দিনটিকে যথার্থভাবে পালন করতে ব্যর্থ হই। নানাবিধ ইসলাম বহির্ভূত কাজে লিপ্ত হয়ে হারিয়ে ফেলি ঈদের মাহাত্ম্য, পাশ্চত্য সংস্কৃতির গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসায়ে আনন্দ উপভোগ করি। ঈদের মুল শিক্ষা থেকে আমরা চলে যাই দূরে, বহু দূরে। এ ধরনের আচরণ থেকে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুসলমানেরই জরুরি।
মহান রাব্বুল আলামীন যেহেতু ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি রুকন পালন করার তাওফীক দিয়েছেন, তাই মুসলিমগণ ঈদের পবিত্র দিনে প্রভুর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, তাঁর বড়ত্ব ও পবিত্রতা ঘোষণা করবে এবং আনন্দের সাথে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন পালন করবে। কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে আজ মুসলিমগণ ঈদের আসল শিক্ষা ভুলে গিয়ে বিভিন্ন পাপাচারিত ও অশ্লীল কাজের মাধ্যমে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার জন্য প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হচ্ছে। সুতরাং ঈদের দিনে যা আমাদের সকলের জন্য বর্জনীয়ঃ

১) বিজাতীয় আচরণঃ
মুসলিম সমাজে এ ব্যাধি ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদে, চাল-চলনে, শুভেচ্ছা বিনিময়ে অমুসলিমদের অন্ধ অনুকরণে লিপ্ত হয়ে পড়েছে মুসলমানদের অনেকেই। এর মাধ্যমে একদিকে তারা সাংস্কৃতিক দৈন্যতার পরিচয় দিচ্ছে অপর দিকে নিজেদের তাহজিব-তামাদ্দুনের প্রতি প্রকাশ করছে অবজ্ঞা-অনীহা। এ ধরনের আচরণ ইসলামে শরিয়তে নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে নবী (সাঃ) বলেনঃ
من تشبه بقوم فهو منهم
‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাথে সাদৃশ্যতা রাখবে সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে। (আবু দাউদ)
এ হাদিসের ব্যাখ্যায় শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) বলেন, এ হাদিসের বাহ্যিক অর্থ হল, যে কাফেরদের সাথে সাদৃশ্যতা রাখবে সে কাফের হয়ে যাবে। যদি এ বাহ্যিক অর্থ আমরা নাও ধরি তবুও কমপক্ষে এ কাজটি যে হারাম তাতে সন্দেহ নেই।

২) পুরুষ কর্তৃক নারীর বেশ ধারণ ও নারী কর্তৃক পুরুষের বেশ ধারণঃ
পোশাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলন ও সাজ-সজ্জার ক্ষেত্রে পুরুষের নারীর বেশ ধারণ ও নারীর পুরুষের বেশ ধারণ হারাম। ঈদের দিনে এ কাজটি অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। হাদিসে এসেছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ
لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم المتشبهات من النساء بالرجال والمتشبهين من الرجال بالنساء
রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষের বেশ ধারণকারী নারী ও নারীর বেশ ধারণকারী পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন। ( আবু দাউদ)

৩) ঈদের দিনে কবর জিয়ারতঃ زيارة القبور يوم العيد
কবর জিয়ারত করা শরিয়ত সমর্থিত একটি নেক আমল। হাদিসে এসেছে। রাসূল (সাঃ) বলেনঃ
كنت نهيتكم عن زيارة القبور، ألا فزوروها فإنها ترق القلب وتدمع العين وتذكر الآخرة، ولا
আমি তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, হ্যাঁ এখন তোমরা কবর জিয়ারত করবে। কারণ কবর জিয়ারত হৃদয়কে কোমল করে, নয়নকে অশ্রুসিক্ত করে ও পরকালকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে তোমরা শোক ও বেদনা প্রকাশ করতে সেখানে কিছু বলবে না। (সহিহুল জামে, হাদিস নং ৪৫৮৪)
কিন্তু ঈদের দিনে কবর জিয়ারতকে অভ্যাসে পরিণত করা বা একটা প্রথা বানিয়ে নেয়া শরিয়ত সম্মত নয়। রাসূলুল্লাহ (মাঃ) বলেনঃ
لا تجعلوا قبري عيداً
তোমরা আমার কবরে ঈদ উদযাপন করবে না বা ঈদের স্থান বানাবে না। (আবু দাউদ)
যদি ঈদের দিন কবর জিয়ারত করা হয় তবে কবরে ঈদ উদযাপন হয়েছে বলে গণ্য হবে। মনে রাখা প্রয়োজন যে ঈদ মানে যা বার বার আসে। যদি বছরের কোন একটি দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করা হয় আর তা প্রতি বছর করা হয় তা হলে এর অর্থই হবে কবরকে ঈদের উৎসব-সামগ্রী হিসেবে সাব্যস্ত করা। আর সেটা যদি সত্যিকার ঈদের দিনে হয় তবে তা আরো মারাত্মক বলে ধরে নেয়া যায়। যখন আল্লাহর রাসূলের কবরে ঈদ পালন নিষিদ্ধ তখন অন্যের কবরে ঈদ উদযাপন করার হুকুম কতখানি নিষিদ্ধের পর্যায়ে পড়তে পারে তা ভেবে দেখা উচতি।
মোটকথা ঈদের দিনকে ফজীলত মনে করে কবর যিয়ারত করা। তবে কেউ ছুটিতে ঈদের দিন নিজ বাড়িতে গেলে মৃত আত্মীয় স্বজনের কবর যিয়ারত করতে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু যারা সারা বছর নিজ দেশেই থাকেন তারা যদি ঈদের দিন বিশেষ গুরুত্বের সাথে কবর যিয়ারত করেন, তাহলে বিদআত হবে।

৪) নারীদের খোলা-মেলা অবস্থায় রাস্তা-ঘাটে বের হওয়াঃ خروج النساء متبرجات
মনে রাখা প্রয়োজন যে খোলামেলা ও অশালীন পোশাকে রাস্তা-ঘাটে বের হওয়া ইসলামি শরিয়তে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى
‘আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন মূর্খতার যুগের মত নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না। (সূরা আহযাবঃ ৩৩) রাসূল (সাঃ) বলেনঃ
صنفان من أهل النار لم أرهما : قوم معهم سياط كأذناب البقر يضربون بها الناس، ونساء كاسيات عاريات، مميلات مائلات، رؤوسهن كأسنمة البخت المائلة لا يدخلن الجنة ولا يجدن ريحها، وإن ريحها ليوجد من مسيرة كذا وكذا
রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জাহান্নাম বাসী দু’ধরনের লোক যাদের আমি এখনও দেখতে পাইনি। একদল লোক যাদের সাথে গরুর লেজের ন্যায় চাবুক থাকবে, তা দিয়ে তারা লোকজনকে প্রহার করবে। আর এক দল এমন নারী যারা পোশাক পরিধান করেও উলঙ্গ মানুষের মত মনে হবে, অন্যদের আকর্ষণ করবে ও অন্যেরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হবে, তাদের মাথার চুলের অবস্থা উটের হেলে পড়া কুঁজের ন্যায়। ওরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এমনকি তার সুগন্ধিও পাবে না, যদিও তার সুগন্ধি বহু দূর থেকে পাওয়া যায়। ( মুসলিম)

৫) নারীদের সাথে দেখা-সাক্ষাত করা এবং তাদের সাথে অশালীন আচরণ বিনিময় করাঃ
দেখা যায় অন্যান্য সময়ের চেয়ে এই গুনাহের কাজটা ঈদের দিনে বেশি করা হয়। নিকট আত্মীয়দের মাঝে যাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ শরিয়ত অনুমোদিত নয়, তাদের সাথে অবাধে দেখা-সাক্ষাৎ করা হয়। রাসূল (সাঃ) বলেনঃ
إياكم والدخول على النساء، فقال رجل من الأنصار يا رسول الله أفرأيت الحمو؟ قال الحمو الموت
রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা মহিলাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখবে। মদিনার আনসারদের মধ্য থেকে এক লোক প্রশ্ন করল হে আল্লাহর রাসূল! দেবর-ভাসুর প্রমুখ আত্মীয়দের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ এ ধরনের আত্মীয়-স্বজন তো মৃত্যু। ( মুসলিম)
এ হাদিসে আরবি ‘الحمو’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ এমন সকল আত্মীয় যারা স্বামীর সম্পর্কের দিক দিয়ে নিকটতম। যেমন স্বামীর ভাই, তার মামা, খালু প্রমুখ। তাদেরকে মৃত্যুর সাথে তুলনা করার কারণ হল এ সকল আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমেই বেপর্দা জনিত বিপদ আপদ বেশি ঘটে থাকে। যেমনটি অপরিচিত পুরুষদের বেলায় কম ঘটে।

৬) ঈদের রাতে বা দিনে অশ্লীল গান, বাজনা, নাচ, ছবি, নাটক ইত্যাদির মাধ্যমে ঈদের আনন্দ উপভোগ করাঃ
ঈদের দিনে এ গুনাহের কাজগুলো বেশি হতে দেখা যায়। গান ও বাদ্যযন্ত্র যে শরিয়তে নিষিদ্ধ এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। আর তা যদি হয় অশ্লীল গান তাহলে তো তা হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোন ভিন্নমত নেই। রাসূল (সাঃ) বলেনঃ
ليكون أقواما من أمتي يستحلون الحر والحرير والخمر والمعازف
আমার উম্মতের মাঝে এমন একটা দল পাওয়া যাবে যারা ব্যভিচার, রেশমি পোশাক, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে। (বোখারি)
এ হাদিস দ্বারা বুঝা যায় গান-বাদ্য নিষিদ্ধ। কারণ হাদিসে বলা হয়েছে ‘তারা হালাল মনে করবে’। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় মূলত এটা হারাম। ইসলামি শরিয়ত কিছু কিছু পর্বে বিনোদনের অনুমতি দিয়েছে।
পরিশেষে আমরা মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানাই, তিনি যেন মুসলিম জাতিকে ঈদ থেকে শিক্ষা নিয়ে তাদের জীবনকে ধন্য করেন এবং ঈদের দিনে সকল ইসলাম বিরুধী আচরণ থেকে মুসলিমদেরকে হেফাজত করেন। আমীন।
প্রিয় ব্লগার ভাই ও বন্ধগণ! আপনাদের দৃষ্টিতে ঈদের দিনের কোন গুরত্বপূর্ণ বিধান ছুটে গিয়ে থাকলে কিংবা আমার এই লেখায় কোন ভুল-ত্রুটি ধরা পড়লে মন্তব্যের ঘরে উল্লেখ করার অনুরোধ রইল।

 

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: