যাদুল মাআদ বা পরকালের পাথেয় পর্ব-৩

 

নামাযে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিরাত কেমন ছিল?
ফজরের কিরাআতঃ
ফজরের নামাযে তিনি ষাট থেকে একশ আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করতেন। তিনি উভয় রাকআতেই সূরা কাফ, সূরা রোম, সূরা তাকভীর, সূরা যিলযালা পড়েছেন। তিনি সূরা ফালাক ও সূরা নাস দিয়েও ফজরের নামায পড়েছেন।
তিনি একদা কোন এক সফরে ছিলেন। তখন তিনি ফজরের নামাযে সূরা মুমিনূন পড়তে সরু করলেন। প্রথম রাকআতে যখন মুসা এবং হারুনের বর্ণনা আসল অর্থাৎ ৪৪ নং আয়াত পর্যন্ত পড়লেন তখন তাঁর কাশি এসে গেল। তখন তিনি কিরাত পাঠ বন্ধ করে রুকুতে চলে গেলেন।
জুমার দিন ফজরের নামাযের প্রথম রাকআতে তিনি আলিফ-লাম-মীম সাজদা এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা ইনসান তথা هل أتى على الإنسان পাঠ করতেন। কেননা এই সূরা দু’টিতে সৃষ্টির সূচনা, শেষ, আদম সৃষ্টি, মুমিনদের জান্নাতে প্রবেশ ও পাপীদের জাহান্নামে প্রবেশের আলোচনা এবং জুমার দিনে যা সংঘটিত হয়েছে ও আগামীতে এতে যা কিছু হবে তার বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। সুতরাং জুমার দিনের বড় বড় ঘটনাগুলো উম্মাতকে ম্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য এই দিনের ফজরের নামাযে সূরা দু’টি পাঠ করতেন। এমনিভাবে তিনি দুই ঈদ এবং জুমার ন্যায় বড় ধরণের সম্মেলনে সূরা কাফ, সূরা কামার, সূরা আলা এবং গাশিয়া পাঠ করতেন।
যোহরের কিরাআতঃ
যোহরের নামাযে কখনও তিনি লম্বা কিরাত পাঠ করতেন। আবু সাঈদ (রা:) বলেন: যোহরের নামাযে কিরাত এত দীর্ঘ করতেন যে, ইকামত শুনে কেউ ইচ্ছা করলে বাকী নামক স্তানে (বর্তমানে যেখানে বাকী গোরস্তান অবস্থিত) গিয়ে প্রয়োজন সমাধা করে ঘরে ফেরার পর ওযু করে মসজিদে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রথম রাকআতেই পেয়ে যেত। তিনি তাতে কখনও সূরা আলিফ-লাম-মীম সাজদাহ তিলাওয়াত করতেন। কখনও সূরা আলা, কখনও লাইল এবং কখনও সূরা বুরুজ তিলাওয়াত করতেন।
আসরের কিরাআতঃ
আসরের নামাযের কিরাত যোহরের নামাযের কিরাতের অর্ধেক পরিমাণ লম্বা করতেন। আসরের লম্বা কিরাত যোহরের সংক্ষিপ্ত কিরাতের সমান ছিল
মাগরিবের কিরাআতঃ
মাগরিবের নামাযের কিরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত আজ কালের কিরাতের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। তিনি একবার তার উভয় রাকআতে সূরা আরাফকে দুইভাগ করে পাঠ করেছেন। একবার তিনি এতে সূরা তুর এবং অন্যবার সূরা মুর-সালাত পড়েছেন।
মাগরিবের নামাযে সব সময় ছোট সূরা পাঠ করার রীতি উমাইয়া খলীফা মারওয়ান বিন হাকামের যুগ থেকে শুরু হয়েছে। তাই যায়েদ বিন ছাবিত (রা:) তার এই কাজের প্রতিবাদ করেছেন। ইমাম ইবনে আব্দুল বার (র:) বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মাগরিবের নামাযে সূরা আলিফ-লাম-মীম সোয়াদ, সাফ্ফাত, দুখান, আলা, তীন, নাস, ফালাক এবং সূরা মুর-সালাত পাঠ করেছেন। কখনও তিনি তাতে ছোট ছোট সূরা পড়েছেন। এ সমস্ত বর্ণনার সবগুলোই সহীহ এবং প্রসিদ্ধ।
ইশার কিরাআতঃ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইশার নামাযে সূরা তীন পড়েছেন এবং মুআয (রা:)এর জন্য তাতে সূরা শামস্, সূরা আলা, সূরা লাইল এবং অনুরূপ সূরা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সূরা বাকারা দিয়ে মুআয (রা:)এর ইশার নামায পড়ানোর প্রতিবাদ করতে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হে মুআয! তুমি কি মানুষকে ফিতনায় ফেলতে চাচ্ছ? যারা নামাযে তাড়াহুড়া করতে পছন্দ করে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বাক্যটি দ্বারা দলীল গ্রহণ করার চেষ্টা করে থাকে। অথচ তারা ঘটনার পূর্বের ও পরের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টিপাত করে নি।
টিকা:
প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, মুআয (রা:) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ইশার নামায পড়তেন। তারপর তিনি তাঁর মহল্লায় গিয়ে ইশার নামাযের ইমামতি করতেন। একবার তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ইশার নামায পড়েও কিছুক্ষণ দেরী করলেন। ঐ দিকে তাঁর মহল্লার লোকেরা তাঁর পিছনে ইশার নামায পড়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। তিনি বিলম্বে ফিরে এসে সেদিন সূরা বাকারা শুরু করে দিলেন। একজন মুসল্লি দীর্ঘ কিরাতে দাঁড়িয়ে থাকতে না পড়ে পিছনে গিয়ে একা নামায পড়ে চলে গেল। এতে মুআয (রা:) বললেন: অমুক মুনাফেক হয়ে গেছে। লোকেরা বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বিষয়টি পেশ করলে তিনি মুআযকে বললেন: হে মুআয! তুমি কি মানুষকে ফিতনায় ফেলতে চাচ্ছ? (বুখারী)
মুআয (রা:)এর মহল্লার লোকেরা যেহেতু তাঁর পিছনে ইশার নামায পড়ার জন্য রাত জেগে অপেক্ষা করতেন, তাই তার জন্য বেশী দীর্ঘ কিরাত শুরু করা উচিত হয় নি। এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআযের কাজকে অপছন্দ করেছেন।
জুমার নামাযের কিরাআতঃ
জুমার নামাযের প্রথম রাকআতে তিনি কখনও সূরা জুমা এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা মুনাফিকুন পড়তেন। আবার কখনও প্রথম রাকআতে আলা এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরাতুল গাশিয়া পাঠ করতেন। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরা জুমা ও মুনাফিকুনের শুধু শেষ আয়াতগুলো দিয়ে কখনও জুমার নামায পড়েন নি।
দুই ঈদের নামাযের কিরাআতঃ
ঈদের নামাযে কখনও তিনি সূরা কাফ ও কামারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করতেন। কখনও তিনি সূরা আলা ও গাশিয়া পাঠ করতেন।
এই ছিল নামাযে কিরাত পাঠের ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সুন্নাত। অর্থাৎ তিনি একেক সময় একেক সূরা দিয়ে নামায পড়েছেন এবং তাতে কখনও ছোট সূরা আবার কখনও বড় সূরা পাঠ করেছেন। তাঁর পরে খাফায়ে রাশেদীনও এই পন্থা অবলম্বন করেছেন। আবু বকর (রা:) একবার ফজরের নামাযে সূরা বাকারা পাঠ করেছেন। এতে তিনি সূর্যোদয়ের একটু পূর্বে সালাম ফিরিয়েছেন। আবু বকরের পরে উমার (রা:) ফজরের নামাযে সূরা ইউসুফ, নাহল, হুদ, বানী ইসরাঈল এবং অনুরূপ সূরা পড়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: তোমাদের কেউ যখন নামাযে মানুষের ইমামতি করবে তখন সে যেন সংক্ষিপ্ত নামায পড়ে। এ ব্যাপারে জেনে রাখা দরকার যে, রাসূল সা: কর্তৃক নামায সংক্ষিপ্ত করার বিষয়টি ছিল আপেক্ষিক। অর্থাৎ তিনি সংক্ষিপ্ত করে যে সমস্ত নামায পড়েছেন বলে বর্ণিত হয়েছে, সে ব্যাপারে কথা হচ্ছে, তাঁর সংক্ষিপ্ত নামাযসমূহ তাঁর দীর্ঘ নামাযগুলোর তুলনায় অধিক সংক্ষিপ্ত ছিল। এমনটি নয় যে তিনি সব সময় সংক্ষিপ্ত করে নামায পড়েছেন। দীর্ঘ বা সংক্ষিপ্ত করার সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাসূল সাঃএর আমলের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে, মুক্তা-দীগণের দাবী অনুযায়ী কিরাত ও নামায দীর্ঘ বা সংক্ষিপ্ত করা যাবে না। রাসূল সা: তাঁর যে সুন্নাত ও তরীকা সব সময় অবলম্বন করেছেন, মতভেদ-পূর্ণ প্রত্যেক বিষয়ে তাই হবে ফয়সালা-কারী। জুমা ও দুই ঈদের নামায ব্যতীত অন্যন্য সকল নামাযে তিনি এভাবে সূরা নির্দিষ্ট করে দেন নি যে, তা ছাড়া অন্যটি পড়া যাবে না।
তঁর সুন্নাত এই ছিল যে, কোন নামাযের এক রাকআতে তিনি পূর্ণ একটি সূরা পাঠ করতেন। কখনও তিনি একই সূরা উভয় রাকআতে পড়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সূরার শেষাংশ বা মাঝখান থেকে পাঠ করার কথা বর্ণিত হয় নি। নফল নামাযের এক রাকআতে কখনও দুইট সূরা পাঠ করতেন। ফরজ নামাযে তিনি কখনও এমনটি করেন নি। একই সূরা একই নামাযের দুই রাকআতে তিনি খুব কমই পাঠ করতেন। তিনি প্রত্যেক নামাযের প্রথম রাকআত দ্বিতীয় রাকআতের তুলনায় অধিক লম্বা করতেন। কখনও তিনি মানুষের পায়ের আওয়াজ না শুনা পর্যন্ত লম্বা করতে থাকতেন।

চলবে ইনশাল্লাহ 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: