যাদুল মাআদ বা পরকালের পাথেয় পর্ব-১

যাদুল মাআদ বা পরকালের পাথেয় পর্ব-১

যাদুল মাআদ ফী হাদয়ী খাইরিল ইবাদ
মূলঃ ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রঃ)
মুখতাসারু যাদিল মাআদ
রচয়িতাঃ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রঃ)
অনুবাদঃ আব্দুল্লাহ শাহেদ।

 সম্পাদনায়ঃ আবু ইউসুফ 

(এটি মুখতাসার যাদুল মাআদের অনুবাদ)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অযুর পদ্ধতিঃ

অধিকাংশ সময় তিনি প্রত্যেক নামাযের জন্য নতুন করে অযু করতেন। কখনও এক অযু দিয়ে একাধিক নামায পড়তেন। তিনি এক মুদ (আনুমানিক ৬৭৫ গ্রাম) পানি দিয়ে অযু করতেন। কখনও তার চেয়ে কম বা বেশী পরিমাণ পানি ব্যবহার করতেন। মূলতঃ তিনি অযুতে সামান্য পানি খরচ করতেন এবং উম্মাতকে অযুর মধ্যে পানি অপচয় করতে নিষেধ করতেন।
সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি কখনও অযুর অঙ্গগুলো একবার করে ধৌত করেছেন। আবার কখনও দুইবার করে আবার কখনও তিনবার করেও ধৌত করেছেন।
এও প্রমাণিত আছে যে, তিনি কোন কোন অঙ্গ দুইবার আবার কোনওটি তিনবার ধৌত করেছেন। কখনও তিনি এক অঞ্জুলি পানি দিয়ে কুলি করতেন এবং নাক পরিস্কার করতেন। কখনও দুই অঞ্জুলি দিয়ে আবার কখনও তিন অঞ্জুলি পানি দিয়েও অনুরূপ করতেন। এক অঞ্জুলি পানি দিয়ে তা করার সময় অর্ধেক মুখে দিতেন আর বাকী অর্ধেক নাকে প্রবেশ করাতেন। দুই বা তিন অঞ্জুলি পানির মাধ্যমে কুলি করলে এবং নাক ঝাড়লেও প্রত্যেক অঞ্জুলির একাংশ মুখে এবং অন্যাংশ মুখে দেয়াও সম্ভব। আর আলাদাভাবে মুখে পানি দিয়ে কুলি করা এবং তারপর আরেক অঞ্জুলি পানি দিয়ে নাক পরিস্কার করাও বৈধ। তিনি ডান হাতের চল্লু থেকে নাকে পানি প্রবেশ করাতেন এবং বাম হাত দিয়ে নাক ঝাড়তেন ও পরিস্কার করতেন।
অযু করার সময় তিনি পূর্ণ মাথা মাসেহ করতেন। দুই হাত দিয়ে মাথার প্রথম থেকে শেষ ভাগ পর্যন্ত মাসেহ করতেন। মাথার শুধু একাংশ মাসেহ করে অন্যান্য অংশ ছেড়ে দেয়ার কথা সহীহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। তবে তাঁর মাথায় যখন পাগড়ি থাকতো, তখন তিনি মাথার প্রথমাংশ মাসেহ করতেন আর পাগড়ির উপর দিয়ে মাসেহ পূর্ণ করতেন।
কুলি করা এবং নাকে পানি দেয়া ব্যতীত তিনি কখনই অযু সমাপ্ত করেন নি। প্রত্যেক অযুতেই তিনি তা করতেন। জীবনে একবারও এই কাজ দুইটিতে ত্রুটি করেছেন বলে প্রমাণিত হয় নি।
অযুর মধ্যে কুরআনে বর্ণিত নিয়মে ধারাবাহিকভাবে অঙ্গগুলোকে ধৌত করতেন। অর্থাৎ প্রথমে মুখ তারপর হাত অতঃপর মাথা মাসেহ এবং সব শেষে পা ধৌত করতেন। অনুরূপভাবে তিনি অঙ্গগুলো পরপর অর্থাৎ একটি শুকিয়ে যাওয়ার আগেই অন্যটি ধৌত করতেন। কখনও তিনি এর ব্যতিক্রম করেন নি। পায়ে চামড়ার বা সাধারণ মোজা না থাকলে তিনি তা ধৌত করতেন। মাথা মাসেহ করার সময় তিনি কানের ভিতর ও বাহিরের অংশও মাসেহ করতেন। নতুন করে পানি নিয়ে কান মাসেহ করার কথা সহীহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। ঘাড় মাসেহ করার ক্ষেত্রে কোন সহীহ হাদীছ নেই।
অযুর অঙ্গগুলো থেকে প্রত্যেক অঙ্গ ধৌত করার দুআর ক্ষেত্রে যতগুলো হাদীছ বর্ণিত হয়েছে তার সবগুলোই বানোয়াট। অযুর শুরুতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু বিসমিল্লাহ বলতেন। আর শেষে এই দুআ পাঠ করতেন।
أَشْهدُ أَنْ لا إِله إِلاَّ اللَّه وحْدَه لا شَريكَ لهُ، وأَشْهدُ أَنَّ مُحمَّدًا عبْدُهُ وَرسُولُه ، إِلاَّ فُتِحَت لَهُ
اللَّهُمَّ اجْعلْني من التَّوَّابِينَ واجْعلْني مِنَ المُتَطَهِّرِينَ
নাসাঈ শরীফে এ ব্যাপারে আরেকটি দুআ বর্ণিত হয়েছে। তা হচ্ছে,
سبحانك اللهم وبحمدك اشهد أن لا إله إلا أنت استغفرك وأتوب إليك
অযুর শুরতে তিনি কখনই نويت বলেন নি অর্থাৎ অযুর নিয়ত মুখে উচ্চারণ করেন নি। তাঁর কোন সাহাবী থেকেও এমনটি করার কথা প্রমাণিত নেই।
তিনবারের বেশী কখনই তিনি অযুর অঙ্গুগুলো ধৌত করেন নি। অনুরূপ কনুই এবং টাখনুর সীমানা ছেড়ে উপরের দিকে পানি ঢেলেছেন বলে প্রমাণিত হয় নি। অযু করার পর কাপড় দিয়ে ভিজা অঙ্গগুলো মুছে ফেলাও তাঁর অভ্যাস ছিল না।
কখনও কখনও তিনি দাঁড়ি খেলাল করতেন, তবে সব সময় তিনি তা করতেন না। আঙ্গুল খেলালের ক্ষেত্রেও অনুরূপ করতেন। সর্বদা তা করতেন না। হাতে পরিহিত আংটিকে নাড়ানোর বিষয়ে একটি যঈফ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে।
সফর ও নিজ বাড়ীতে অবস্থান করার সময় মোজার উপর মাসেহ করার হাদীছ সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। মুকীমের জন্য এক দিন এক রাত এবং মুসাফিরের জন্য তিন দিন তিন রাত সময় নির্ধারণ করেছেন। তিনি মোজার উপরের অংশ মাসেহ করতেন। কাপড়ের মোজার উপরও তিনি মাসেহ করতেন। এমনকি জুতার উপর মাসেহ করার হাদীছও সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
তিনি শুধু পাগড়ির উপর মাসেহ করেছেন এবং মাথার প্রথমাংশ মাসেহ করে বাকী অংশের উপর পরিহিত পাগড়ির উপরও মাসেহ করেছেন। তবে সম্ভবতঃ বিশেষ প্রয়োজনে তা করেছেন। এও হতে পারে যে মোজার উপর মাসেহ করার ন্যায় সকল অবস্থাতেই তা জায়েয। এটিই অধিক সুস্পষ্ট। আল্লাহই ভাল জানেন।
তাঁর পা দু’টি যখন মোজা দ্বারা ঢাকা থাকতে তখন তিনি তার উপর মাসেহ করতেন এবং খালী থাকলে তা ধৌত করতেন।
তায়াম্মুম করার সময় তিনি মাটিতে একবার হাত লাগিয়েই মুখমন্ডল এবং উভয় হাত মাসেহ করতেন। যেই যমীনের উপর তিনি নামায পড়তেন তাতেই তিনি তায়াম্মুম করতেন। শুকনো মাটি, বা বেলে মাটি এবং কাদাসহ সকল শ্রেণীর মাটি দিয়েই তায়াম্মুম করা বৈধ।
সহীহ সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেনঃ আমার উম্মতের কোন ব্যক্তির নিকট যখনই নামাযের সময় উপস্থিত হবে তখন তার সাথেই রয়েছে মসজিদ ও নামাযের জন্য পবিত্রতা অর্জণের উপকরণ তথা তায়াম্মুমের জন্য মাটি বা মাটি জাতীয় বস্তু।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাথীগণ যখন তাবুক যুদ্ধে বের হলেন তখন মরুভূমির বালুময় দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছেন। তাদের সাথে অতি সামান্য পরিমাণ পানি ছিল। তিনি এই সফরে সাথে মাটি নিয়েছিলেন বা মাটি সাথে রাখার আদেশ দিয়েছিলেন বলে কোন কিছুই বর্ণিত হয় নি। তাঁর কোন সাহাবীও এমনটি করেন নি। যে ব্যক্তি এ বিষয়ে চিন্তা করবে সে নিশ্চিতভাবে বুঝতে সক্ষম হবে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বালি দিয়েই তায়াম্মুম করতেন।
প্রত্যেক নামাযের জন্য নতুনভাবে তায়াম্মুম করেন নি বা তা করার আদেশ দেন নি। বরং তিনি সাধারণতঃ তায়াম্মুম করেছেন এবং অযুর স্থলাভিষিক্ত করেছেন। এতে বুঝা যাচ্ছে অযুর হুকুম-আহকাম তায়াম্মুমের ক্ষেত্রেও প্রেযোজ্য। ব্যতিক্রম কিছু থাকলে অবশ্যই তা বর্ণিত হতো।
                                                                                (চলবে ইনশাল্লাহ)

One Response

  1. […] যাদুল মাআদ বা পরকালের পাথেয় পর্ব-১ […]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: