প্রচলিত জাল বা মওযু হাদীস

প্রচলিত জাল বা মওযু হাদীস

প্রচলিত জাল বা মওযু হাদীস

আমাদের সমাজে প্রচুর সংখ্যক জাল বা মওযু হাদীস প্রচলিত আছে যে গুলি কোনটাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন নি এবং কোন হাদীস গ্রন্থেও তা নেই। সকল হাদীসই ভাল কথা কিন্তু সকল ভাল কথা হাদীস নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন কারো মিথ্যাচারী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা কিছু শুনে তাই আমার নামের সাথে সংযুক্ত করে বর্ণনা করা শুরু করে। “প্রচলিত জাল হাদীস” নামক একটা খুব সুন্দর বই বাংলা ভাষায় পাওয়া যায়। বইটির লেখক হলেন মাওলানা আব্দুল মালেক ও মাওলানা মুতিউর রহমান। বইটির ভূমিকায় বায়তুল মোকাররম মসজিদের প্রাক্তন খতিব মরহুম মাওলানা উবায়দুল হক, হাটহাজারি মাদ্রাসার মুহতামিম আহমদ শফী ও পটিয়া মাদ্রাসার মহাপরিচালক গোলাম রাব্বানি বইটির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত করেছেন। আমি এখানে ঐ বই থেকে ধারাবাহিক ভাবে কিছু জাল হাদীস বর্ণনা করবো।
১. মুমিনের কলব আল্লাহর আরশ। এটা একটা জাল হাদীস।

২. দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করো। এটাও একটা জাল হাদীস। এটা মূলত আরবী ভাষার একটা প্রবাদ।

৩. আমার উম্মতের আলেমগনের মর্যাদা বনী ইসরাইলের নবীগণের তুল্য। এটাও একটা জাল হাদীস। মূল হাদীস টা হল আলেম রা হল নবীগণের ওয়ারীশ।

৪. আলেমদের সাথে এক মুহুর্ত কাটানো ৬০ বছরের নফল ইবাদত থেকে উত্তম, কোন আলেমের পিছনে ১ রাকাত নামায পড়া নিজে নিজে ১০০০ রাকাত নফল নামায পড়া থেকে উত্তম এগুলি সব জাল হাদীস। হ্যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নেককার লোকদের সাথে উঠাবসা করতে বলেছেন কিন্তু এই জাতীয় কথা উনি কখনো বলেন নি।

৫. স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত এটাও একটা জাল হাদীস। মূল হাদীস টা হল মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।

৬. মসজিদে দুনিয়াবী কথা বলা হারাম, মসজিদে দুনিয়াবী কথা বললে ৪০ বছরের নেকী নষ্ট হয়ে যায় এগুলি সব জাল হাদীস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নব্বীর ভিতরেই বিচার কার্য, জিহাদ সংক্রান্ত অনেক আলোচনা করেছেন।

৭. মাথায় পাগরী পরে ২ রাকাত নামায পাগড়ী বিহীন ৭০ রাকাত নামায পড়া অপেক্ষা উত্তম এটাও একটা জাল হাদীস।

৮. বিবাহিত ব্যক্তির ২ রাকাত নামায অবিবাহিত ব্যক্তির ৭০ রাকাত নামায অপেক্ষা উত্তম এটাও একটা জাল হাদীস।

৯. মুমিনের ঝুটা ঔষধ এটাও একটা জাল হাদীস। কখনো কোন তাবেঈন কোন সাহাবীর খাবারের ঝুটা খাননি।

১০. ডান হাতের নখ প্রথমে কনিষ্ঠাঙ্গুল তারপর অনামিকা এরপর বৃদ্ধাঙ্গুল এই জাতীয় নখ কাটার ব্যাপারে যত বর্ণনা পাওয়া যায় এগুলি সব জাল হাদীস। হ্যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব ভাল কাজ প্রথমে ডান দিক থেকে শুরু করতেন এটা ঠিক কিন্তু কোন নির্দিষ্ট নিয়মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনোই হাত পায়ের নখ কাটতেন না।

১১. যে নিজেকে চিনল সে তার রব কে চিনল এটাও একটা জাল হাদীস।

১২. মরার আগে আগে মর এটাও একটা জাল হাদীস।

১৩. যে ব্যক্তি বরকতের জন্য সন্তানের নাম মুহাম্মদ রাখবে, ঐ সন্তান ও তার পিতা উভয়েই জান্নাতে যাবে। এটাও একটা জাল হাদীস। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন তোমরা নবীদের নামে নাম রাখ এবং আল্লাহ তায়ালার নিকট সবচেয়ে প্রিয় নাম হল আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান।

১৪. মেরাজের রজনীতে জিবরাইল আলাইহিস সাল্লাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত যেয়ে বলেছিলেন যে আমি আর একটু সামনে অগ্রসর হলে আমি ভস্ম হয়ে যাবো এটাও একটা জাল হাদীস। বরং মিরাজ রজনীর পুরাটাই জিবরাইল আলাইহিস সাল্লাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সব সময় ছিলেন।

১৫. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ৭০ হাজার বার পরে মৃত
ব্যক্তির নামে উত্সর্গ করলে ঐ মৃত ব্যক্তি কবরের আযাব থেকে মুক্তি পাবে এটাও একটা জাল হাদীস। হ্যা কালেমা তাইয়েবা পড়ার অনেক ফযীলত আছে কিন্তু ঠিক একথাটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন নি।

১৬. খাবারের আগে লবণ খাওয়া সুন্নত, খাবারের আগে পরে লবণ খেলে ৭০ টি রোগ থেকে বেচে থাকা যায় এগুলি সব জাল হাদীস।

১৭. শবে বরাত/শবে কদরের রাতে গোসল করলে গোসলের ফোটার সাথে সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায় এটাও একটা জাল হাদীস। শবে কদর/শবে বরাত রাতের নামায বলতে যে হাদীস গুলি শোনা যায় এগুলি সব জাল হাদীস।

১৮. আল্লাহ সুবহানাতায়ালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সৃষ্টি না করলে জান্নাত জাহান্নাম দুনিয়া সৃষ্টি করতেন না এটাও একটা জাল হাদীস।

১৯. সর্বপ্রথম আল্লাহ সুবহানাতায়ালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নূর তৈরী করেছেন তারপর ঐ নূর থেকে দুনিয়ার সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন, যখন আদম সৃষ্টি হয়নি তখনও আমার নূর ছিল এই জাতীয় সকল বর্ণনা গুলি জাল হাদীস। বরং সহীহ হাদীসটা হল যখন আদম আলাইহিস সাল্লাম সৃষ্টি হয় নি তখনও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাম লওহে মাহফুজে লেখা ছিল। আমি এখানে আমাদের সমাজের বহুল প্রচলিত কতিপয় জাল হাদীস নিয়ে আলোচনা করলাম। মূলত তাবে তাবেঈন দের যুগ থেকে মুসলিম সমাজে রাফেযী, খারেজী, মুতাজিলা প্রভৃতি যে সকল বিভ্রান্ত আকীদার জন্ম হয়েছিল তারাই এই সকল জাল হাদীস গুলি সুকৌশলে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য সুকৌশলে মুসলিম উম্মাহর মাঝে সুকৌশল ছড়িয়ে দেয়। সত্যি কথা বলতে কি এই সকল জাল হাদীসের জন্য আমাদের সমাজে অনেক সামাজিক সমস্যাও সৃষ্টি হচ্ছে। আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সকলকে সহীহ হাদীস বুঝে জীবন চলার তৌফিক দেন।

সগৃহীত:

Advertisements

5 Responses

  1. জাযাকাল্লাহু খাইরান। এমন অসংখ্য জাল ও বানোয়াট হাদীস মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত আছে। এ সকল জাল হাদীস কে কেন্দ্র করে সমাজে অনেক বিশৃংখলা সৃষ্টি হয় এবং এ মাধ্যমে ইসলামে সৌন্দর্য বিনষ্ট হয়।

  2. ধন্যবাদ আপনাকে অনেক কিছু জানলাম

  3. Allah apnake Jannat basider onto vukto korun

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: